রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ০৬:৩৬ পূর্বাহ্ন
রাজনীতিতে দীর্ঘ পথচলার পরও অনেক নেতার প্রাপ্তি সীমিত থাকে, কিন্তু জনগণের আস্থা ও কর্মীদের ভালোবাসা তাঁদের রাজনৈতিক শক্তিকে অটুট রাখে। কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার চন্দনপুর ইউনিয়নের পরিচিত মুখ মো. সেলিম সরকার তেমনই একজন রাজনৈতিক নেতা, যাঁর নাম এখন ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ ও দলীয় নেতাকর্মীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
সেলিম সরকারের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ২০০৫ সালে। সে সময় চন্দনপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি পল্লী চিকিৎসক সাহাবুদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেন মেম্বারের নেতৃত্বাধীন কমিটিতে তিনি সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি উপজেলা বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। ২০১৬ সালে তিনি চন্দনপুর ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০১৯ সাল পর্যন্ত সফলতার সঙ্গে এ দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক রমিজ উদ্দিন লন্ডনী ও সদস্য সচিব সালাউদ্দিন সরকারের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে তিনি চন্দনপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব লাভ করেন। এরপর থেকে তিনি ধারাবাহিকভাবে ইউনিয়ন বিএনপির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন এবং ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এছাড়া রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও তাঁর সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিনের। ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি চন্দনপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। পরবর্তীতেও দলের সঙ্গে থেকে তিনি এলাকার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত অর্থায়নে তুলাতুলী কবরস্থানের বাউন্ডারি নির্মাণ, বাজারের পাকা ঘাটলা নির্মাণসহ চোখে পড়ার মতো অনেক কাজ রয়েছে। তৎকালীন সময়ে প্রবাসজীবনে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ তিনি মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেছেন বলে এলাকাবাসীর মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করেছেন।
নির্বাচনী ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একাধিকবার চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও তিনি বিজয়ের মুখ দেখতে পারেননি। ২০০৩ সালে বিএনপি সরকারের আমলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চেয়ার প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে মাত্র ১২১ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। পরে ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আনারস প্রতীক নিয়ে ৮৩ ভোটের ব্যবধানে দ্বিতীয় হন। ২০১৬ সালে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে তৃতীয় স্থান লাভ করেন। সর্বশেষ ২০২৩ সালে প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা আহসান উল্লাহ চেয়ারম্যানের মৃত্যুর পর অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে চশমা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৬৭ ভোটের ব্যবধানে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন।
সেলিম সরকার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, অতীতের বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে তাঁর সমর্থকদের প্রবেশে বাধা, ভোট জালিয়াতি এবং নানা ধরনের অনিয়মের কারণে তিনি বারবার কাঙ্ক্ষিত ফলাফল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল্লাহ মিয়া রতন শিকদার কয়েকশ মানুষ নিয়ে তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করেন। রাজনৈতিক জীবনে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছে। ২০২৩ সালের ৪ নভেম্বর দায়ের হওয়া একটি মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি রাজধানীর ওয়ারী থানার বিস্ফোরক আইনের মামলায় প্রায় আড়াই মাস কারাভোগ করেন এবং ২০২৪ সালের ১২ জানুয়ারি কারামুক্ত হন।
দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, চন্দনপুর ইউনিয়নের রাজনৈতিক অঙ্গনে মো. সেলিম সরকার এখন একটি আলোচিত নাম। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের পাশে থেকে রাজনৈতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করা এবং ধারাবাহিকভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁকে ইউনিয়নবাসীর কাছে একজন গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এলাকাবাসীর একটি বড় অংশ মনে করে, ইউনিয়নের সার্বিক উন্নয়ন ও জনস্বার্থে কাজ করার সুযোগ পেলে তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন। একই সঙ্গে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মীর বিশ্বাস, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, ত্যাগ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার কারণে ইউনিয়ন বিএনপির নেতৃত্বেও তাঁর প্রয়োজন রয়েছে। ফলে তাঁকে আগামী দিনে চন্দনপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-উভয় পদেই দেখতে চাওয়ার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
এদিকে বিএনপি নেতা সিরাজুল ইসলাম বাবু তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে মো. সেলিম সরকারকে নিয়ে একটি ইতিবাচক পোস্ট দিলে তা দলীয় নেতাকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পোস্টটির মন্তব্যের ঘরে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা সেলিম সরকারের রাজনৈতিক জীবন, ত্যাগ ও দলীয় অবদান নিয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেন।
মন্তব্যে বিএনপি নেতা মো. শাহজালাল বলেন, “বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মিথ্যা মামলায় কারাগারে থাকার পর সেলিম সরকার মুক্তি পেলে আমি ও দিলারা আপা রাজধানীর তাঁর ওয়ারীর বাসায় গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছিলাম। বর্তমানে বিএনপিতে অনেক হাইব্রিড নেতা থাকলেও সে সময় তাঁর পাশে দাঁড়ানোর ও খোঁজখবর নেওয়ার মতো লোক খুব কমই ছিল।”
রমজান আলী সরকার বলেন, “সেলিম সরকার যখন নৌকা প্রতীকের বিপরীতে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে চন্দনপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন, তখন বড় বড় নেতারা তাঁর পাশে ছিলেন না। তাকে আমরা চন্দনপুর ইউনিয়নের সভাপতি ও চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে চাই। তাকে নিয়ে হাইব্রিডদের কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হবে না, সত্যের জয় হবেই ইনশাআল্লাহ।”
অপরদিকে মো. জাহিদ হাসান বলেন, “সেলিম সরকার দুঃসময়ের পরীক্ষিত সৈনিক। ত্যাগ, সাহস ও নেতৃত্বের জন্য তিনি সবসময় সম্মানের দাবিদার। দুঃসময়ে যারা রাজপথে থেকে দল ও জনগণের জন্য সংগ্রাম করেছেন, তাদের অবদান কখনো অস্বীকার করা যায় না। তিনি একজন সংগ্রামী, সাহসী ও জনবান্ধব নেতা। তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও রাজনৈতিক সফলতা কামনা করছি।”
অন্যদিকে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দাদের মতে, দীর্ঘদিন সংগ্রাম, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সেলিম সরকার যে অবস্থান তৈরি করেছেন, তা চন্দনপুর ইউনিয়নের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এখন জনগণ ও দলীয় কর্মীদের এই প্রত্যাশার প্রতিফলন ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্ব নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কতটা প্রকাশ পায়, সেটিই দেখার বিষয়।