বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ০৭:২৪ অপরাহ্ন
নোয়াপাড়ার এক উঠোনে বসে বইয়ের পাতা উল্টায় আরশাদুল ইসলাম। দুই হাত না থাকায় নেই আঙুল, তবু চোখজুড়ে অদম্য কৌতূহল। শব্দ করে না পড়লেও প্রতিটি অক্ষর যেন সে মনে মনে উচ্চারণ করে নেয়। স্কুলে যেতে পারে না প্রায় এক বছর। তবু স্বপ্ন দেখা বন্ধ হয়নি তার।
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শিদলাই ইউনিয়নের শিদলাই ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নোয়াপাড়া এলাকায় নানাবাড়িতেই জন্মের পর থেকে বড় হচ্ছে আরশাদুল। জন্মগতভাবে দুই হাত না থাকা এই শিশুর জীবন শুরু থেকেই সংগ্রামের। বাবার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার শিমরাইল গ্রামে হলেও বাস্তবতার নির্মমতায় সেই ঠিকানায় তার শেকড় আর ফেরেনি। আরশাদুলের বাবা সুমন মিয়া পেশায় ছিলেন একজন রাজমিস্ত্রি। তিন বছর আগে হঠাৎ মৃত্যুই বদলে দেয় পুরো পরিবারটির ভবিষ্যৎ। সংসারের হাল ধরতে গিয়ে ভেঙে পড়ে সবকিছু। নানীর সহায়তায় কোনোভাবে চলছিল আরশাদুলের পড়াশোনা। কিন্তু অর্থাভাবে একপর্যায়ে থেমে যায় স্কুলজীবন। নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারলে সে এখন পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী হতো।
আরশাদুলের মা মিনুয়ারা বেগম ব্রাহ্মণপাড়া সদরে ভাড়া বাসায় অন্য সন্তানদের নিয়ে থাকেন। সেলাইয়ের কাজ করে কোনো রকমে সংসার চালান তিনি। জীবিকার তাগিদেই আরশাদুলকে নানাবাড়িতে রেখে যেতে বাধ্য হয়েছেন। মায়ের কাছে থাকতে না পারার কষ্ট যেমন আছে, তেমনি আছে স্কুলে যেতে না পারার বেদনা। তবু আরশাদুল থেমে যায়নি। স্কুলের পোশাক নেই, ব্যাগ নেই, কিন্তু বইয়ের প্রতি তার ভালোবাসা অটুট। সুযোগ পেলেই বই-খাতা নিয়ে বসে পড়ে। কেউ পড়িয়ে দিলে মন দিয়ে শোনে। চোখে তার একটাই স্বপ্ন আবার স্কুলে ফেরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও আরশাদুল খুবই মেধাবী। একটু সহায়তা আর নিয়মিত সুযোগ পেলে সে অনেক দূর যেতে পারবে। ছেলেটার ইচ্ছাশক্তি আমাদের অনেক সুস্থ শিশুর চেয়েও বেশি। এই অদম্য ইচ্ছাশক্তির খবর পৌঁছেছে প্রশাসনের কাছেও।
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা জাহান সম্প্রতি আরশাদুলের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তার বন্ধ হয়ে যাওয়া পড়াশোনা পুনরায় চালু করতে প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী উপহার দেন তিনি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতেও পড়াশোনাসহ সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘শিদলাই এলাকার শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশু আরশাদুল ইসলামকে পড়াশোনায় উৎসাহিত করার জন্য এবং তার শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে প্রয়োজনীয় কিছু উপকরণ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধকতা কোনো শিশুর শিক্ষার পথে বাধা হতে পারে না। আরশাদুলের মতো সাহসী ও আগ্রহী শিশুর পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব।’
এলাকাবাসী মনে করেন, প্রশাসনের এই মানবিক সহায়তায় নতুন করে আলো দেখছে আরশাদুলের স্বপ্ন। দুই হাত না থাকলেও তার ইচ্ছাশক্তি অটুট। সহানুভূতি আর সহযোগিতার স্পর্শ পেলে সে যে আলোকিত ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।